ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম (টিভি),কুষ্টিয়ার কুমারখালীর গড়াই নদী থেকে,বুধবার, ২৮ জুন ২০২৩ : ঈদের আগেই উপহার হিসেবে ৯০ কোটি টাকার সেতু পেলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর গড়াই নদীর পাড়ের বাসিন্দারা। স্বাধীনতার ৫২ বছর পর নির্মিত এ সেতুকে ঘিরে স্থানীয়দের জীবন ও অর্থনীতির চিত্র বদলে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। জনসাধারণের চলাচলের জন্য আজ (বুধবার, ২৮ জুন) সেতুটি উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। সেতুটির প্রস্তাবিত নামকরণ করা হয়েছে শহীদ গোলাম কিবরিয়া সেতু।
Advertisement
এরই মধ্যে সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ হলেও সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজের অগ্রগতি প্রায় ৯৭ শতাংশ।
কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনের সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জ এটি উদ্বোধন করে বলেন, ‘আমার নির্বাচনী ওয়াদা ছিল এ সেতুটি উপহার দেয়া। সেটি বাস্তবায়ন করতে পেরে খুশি। ঈদের আগে এ সেতু প্রধানমন্ত্রী ও আমার পক্ষ থেকে জনগণের জন্য উপহার।’
এদিকে, এ সেতুটিকে ঘিরে কৃষক, ব্যবসায়ী, তাঁতি, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও শ্রমিকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করেছেন। দুপাড়ের বাসিন্দাদের মেলবন্ধনসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের স্বপ্ন দেখছেন তারা।
স্থানীয়রা বলছেন, সেতুটি চালু হওয়ায় এখানকার মানুষ এখন খুব সহজে, নিরাপদে ও কম সময়ে চলাচল করতে পারবেন। অন্যদিকে, এজন্য ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি জীবনমানেরও উন্নয়ন হবে বহুগুণ।
জানা গেছে, সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত কুষ্টিয়ার প্রাণকেন্দ্র এ কুমারখালী প্রায় ছয় থেকে সাত লাখ মানুষের বাস। এখানে রয়েছে তাঁত শিল্পের ইতিহাস-ঐতিহ্য। পদ্মা ও গড়াই দ্বারা বিভক্ত এ উপজেলায় রয়েছে একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন। পদ্মা নদীর ওপারে (উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল) রয়েছে একটি ইউনিয়ন চর সাদিপুর। আর গড়াই নদীর এপারে (দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল) এখানে যদুবয়রা, পান্টি, চাঁদপুর, বাগুলাট ও চাপড়া নামে পাঁচটি ইউনিয়ন রয়েছে।
এছাড়াও পদ্মা ও গড়াই নদীর মাঝে রয়েছে কুমারখালী পৌরসভা, কয়া, শিলাইদহ, নন্দনালপুর, জগন্নাথপুর ও সদকী ইউনিয়ন। এখানে রয়েছে উপজেলা চত্বর, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, থানা, প্রধান শহর, আঞ্চলিক মহাসড়ক ছাড়াও দর্শনীয় স্থান ও বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র।
কমবে ভোগান্তি, বাঁচবে জীবন
এতদিন সেতু না থাকায় স্থানীয়দের উপজেলা পর্যায়ের সেবা নিতে নৌকার সাহায্য নিতে হতো। এতে সময় ও অর্থ অপচয়ের সঙ্গে পোহাতে হতো চরম ভোগান্তি। এছাড়া খেয়াঘাটে বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে, ঘাট পরিচালনা কর্তৃপক্ষ ও মাঝিদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডাসহ নানান দুর্ঘটনায় জীবন কাটছিল সবার। রোগী ও স্বজনদের দুর্দাশাও ছিল অবর্ণনীয়।

স্থানীয়রা বলছেন, সেতুটি খুলে দেয়ায় মানুষের ভোগান্তি কমবে, বাঁচবে সময় ও অর্থ। যেকোনো সেবা এখন সহজেই পাওয়া যাবে। দুপাড়ের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হবে। ঘটবে অর্থনৈতিক বিপ্লব।
বাড়বে উৎপাদন ও বেচাকেনা
সেতুটি হওয়ার আগে স্থানীয়দের উৎপাদিত কাপড় এবং ফসল বিক্রিতে ভালো ভোগান্তি পোহাতে হতো। যানবাহন চলাচলের সুযোগ না থাকায় বেশি খরচে উৎপাদিত পণ্য সদরে আনতে হতো। অনেক সময় বৈরী আবহাওয়ার কারণে পণ্য সঠিক সময়ে বাজারে না আনায় ক্ষতির মুখেও পড়তেন উৎপাদকরা।
জোতমোড়া গ্রামের কৃষক ছলিম শেখ বলেন, প্রতিদিনই পৌরবাজারে সবজি বিক্রি করতে যাই। নৌকায় চলাচলে খরচ, কষ্ট ও সময় বেশি লাগে। সেতু চালু হওয়ায় এখন সবকিছু খুব সহজ হবে।
পান্টি গ্রামের তাঁতি মানিক হোসেন বলেন, শনি ও মঙ্গলবার কুমারখালীতে কাপড়ের বড় হাট বসে। সেতু হওয়ার আগে অনেক কষ্ট করে হাটে কাপড় নিতে হতো। এখন আর তা হবে না।
Advertisement
যদুবয়রা ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় লুঙ্গি ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার বলেন, খুব সকালে হাটে কাপড়ের ভালো দাম থাকে। নৌকায় হাটে পৌঁছাতে দেরি হয়। ভোগান্তির জন্য একদিনে বেশি মালও নেয়া যায় না। সেতু হলে খুব সহজেই গাড়ি গাড়ি মাল নেয়া সম্ভব হবে। এতে খরচ কমবে, লাভও বাড়বে।
কুমারখালী সরকারি কলেজের ছাত্র রাকিব হাসান বলেন, ‘একটা নৌকা মিস করলে প্রায় ৩০ মিনিট ঘাটেই কেটে যায়। এতে সময়মতো কলেজে যাওয়া যেত না। পরীক্ষার সময় আমাদের খুব বিড়ম্বনায় পড়তে হতো।’
চৌরঙ্গী মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক আনিসুর রহমান বলেন, সেতুটি চালু হওয়ায় দুপাড়ের মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে। এজন্য এখন মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারি সেবার ব্যাপক প্রসারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটবে।

কুমারখালী কাপুড়িয়া হাটের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হলে এমনিতেই ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো হয়। সেতুটি চালু হওয়ায় ব্যবসা বহুগুণে বেড়ে যাবে।
সেতু বানাতে কত খরচ
উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গড়াই নদীর ওপর চুক্তিমূল্য প্রায় ৮৯ কোটি ৯১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৯১ টাকা ব্যয়ে ৬৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের পিসি গার্ডার ব্রিজ (সেতু) ও প্রায় ৫৫০ মিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজও শেষপ্রায়।
Advertisement
২০১৯ সালের ১৭ এপ্রিল সেতুটির কাজ শুরু করে ঠিকাদারি দুই প্রতিষ্ঠান। ২০২১ সালের ২৫ অক্টোবর কাজের নির্ধারিত সময় শেষ হয়। এরপর কাজের সময় বাড়ানো হয়েছে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত।
